তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে আমাদের ফ্লাইট
শুরু হলো এবং করাচি বিমানবন্দরে নামলাম। তখন তেজগাঁও বিমানবন্দরের ছাদে উঠে অপেক্ষমাণ
আত্মীয়স্বজনদের অভিবাদন জানাতে পারতেন বিদেশগামী যাত্রীরা। করাচি বিমানবন্দরেও একই
অবস্থা ছিল। যথারীতি আমার বন্ধু আশরাফ উদ্দিন আমাকে করাচি বিমানবন্দরে রিসিভ করল। আমি
যাওয়ার সময় কলা ও আনারস নিয়ে গিয়েছিলাম। কলা ও আনারস পেয়ে সে খুব খুশি হয়েছিল। কিছু
দিন বন্ধুর ম্যাসে কাটালাম। পরে আরেকটি ম্যাসে উঠলাম। নূর মোহাম্মদ ভূঁইয়া নামে আমার
এক আত্মীয় ও প্রতিবেশী আমাকে খুবই খাতির করলেন। এ দিকে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ছোটাছুটি
করলাম। করাচির সচিবালয়ের অফিসগুলো ব্যারাকের মতো ছিল। আমার শিক্ষা সনদগুলো সত্যায়িত
করতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অফিসে যেতাম। সেখানকর কর্মকর্তারা অবাধে তা সত্যায়িত করে
দিতেন।
সে সময় একটি বিষয় আমার চোখে পড়ল। আর
তা হলো প্রতিটি ব্যারাকে কম-বেশি ১০০ জন কর্মকর্তা কর্মচারী চাকরি করতেন। হিসেবে পূর্ব
পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) অর্ধেক কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা ছিল। আর তা না
হলেও কমপক্ষে ২৫ শতাংশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ তখনকার প্রশাসনে
যেসব চাকরি করত তার বেশির ভাগই মেসেঞ্জার, এলডিসি, ইউডিসি, থার্ড গ্রেডে সুপারিনটেনডন্ট
ও দুই একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন। যতই বলত ইয়ার ক্যা হাল, কিন্তু লুক্কায়িত ছিল
আমাদের দিকে নিচু দৃষ্টি, দেখলেই বলতো বাঙাল চে আয়া। তারা ইস্ট পাকিস্তানও বলত না।
ফেডারেল ক্যাপিটাল এরিয়াতেও একটি প্রাইমারি
স্কুল ছিল। পরে সেই প্রাইমারি স্কুল আপগ্রেড করা হয়েছিল। প্রফেসর মুজিবুর রহমান খান
করাচি ইউনিভার্সিটির বাংলার প্রফেসর ছিলেন। তার উদ্যোগেই এই স্কুলটি পরিচালিত হতো।
এই স্কুলটি অভিভাবকদের অনুদানেই চলত। আমাকে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার কথা বললে আমি সাথে সাথে
রাজি হয়ে গেলাম। বেতন ধরা হলো দেড় শ’ টাকা। আমি কাজ শুরু করলাম। আর নিয়মিত বেতন পেতে
থাকলাম। এটা ১৯৭০ এর জুলাই মাসের কথা। অর্থাৎ আমি চার মাস বেকার ছিলাম। আমার সাথে থাকা
টাকা দিয়েই আমি চার মাসের থাকা খাওয়ার ব্যয় মিটিয়েছি। সরকারি করাচি বাংলা স্কুল নামে
খ্যাত এ স্কুলটি গান্ধী গার্ডেনের কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। স্কুলের সুবিধা ছিল সকালে
মেয়েদের মর্নিং শিফট এবং ছেলেদের ডে শিফট।
এর আগে বাড়ি থেকে মুরুব্বিরা আমার
কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন আমাদের প্রতিবেশী এক কর্মকর্তা জহিরুল হক খানকে উদ্দেশ করে।
আমাকে চাকরিতে সহযোগিতা করার জন্য তার বড় ভাই লিখেছিলেন। এই জহিরুল হক খান হলেন মরহুম
হুমায়ুন জহিরের শ্বশুর। হুমায়ুন জহির হলেন আমার এক বছরের সিনিয়র ও আমরা একই স্কুলে
পড়েছি। তিনি এসএসসিতে স্ট্যান্ড করেছিলেন। দেশে ফিরে লায়নিজম করার সময় বহুবার তার সাথে
দেখা হয়েছে। যতবারই বড় কোনো অনুষ্ঠানে গিয়েছি, লটারির টিকিট কিনে আমার ছেলের হাতে গুঁজে
দিয়েছেন।
চিঠি দিতে গিয়ে জানলাম, জহিরুল হক
খান ইসলামাবাদে বদলি হয়ে গেছেন। যে অফিস থেকে বাসা বরাদ্দ হতো তার প্রধানকর্তা ছিলেন
জহিরুল হক খান। যার কারণে আমাদের দেশের অনেকেরই তিনি চাকরি দিয়েছিলেন। তাদের পরামর্শ
মোতাবেক আমি ইসলামাবাদে টেলিফোন করার সুযোগ খুঁজি। টেলিফোন সংস্থার
এক ব্যক্তির সাথে চেয়ারম্যানের পিএস
এর পরিচয় ছিল। সেই সূত্রে তাকে বলার পর তিনি ইসলামাবাদে জহিরুল হক খান সাহেককে টেলিফোনে
লাগিয়ে দিলেন। আমারই বোকামি ধরা পড়ল। আমি টেলিফোনটা উল্টো ধরেছি। এই প্রথম আমি টেলিফোন
ধরা শিখলাম। অথচ এখন আমার ২-৩ বছরের নাতি-নাতনিরাও আইফোনের পর্দা টানে।
বাংলা স্কুলে জয়েন্ট করার পরে অনেকের
সাথেই জানাশোনা হলো। নতুন কিছু টিউশনিও পেয়ে গেলাম। ফরিদপুরে বাড়ি ডিবি অফিসের এক অফিসারের
ছেলে মিজানকে পড়াতে লাগলাম। তারা তাদের বাসায় আমাকে অসম্ভব খাতির যত্ন করত। আরেকজনকে
পড়াতাম ডিফেন্স হাউজিং সোসাইটিতে। সুফিয়া আমিনের ভাইকে পড়াতাম। সুফিয়া আমিনের বাবা
বাংলাদেশের একজন অন্যতম শিল্পপতি ছিলেন এবং তার স্বামী আশরাফুল আমিন ছিলেন পাকিস্তান
ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চিফ ম্যানেজার। সুফিয়া আমিন করাচি রেডিওতে বাংলায় গান গাইতেন।
আমি একবার পাকিস্তানের ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কম্পিউটার ডিপার্টমেন্টে চাকরির জন্যে
আবেদন করলাম। যথারীতি আমার ইন্টারভিউতে ডাক পড়ে। আমি ইন্টারভিউ দেয়ার জন্য ইন্টারভিউ
বোর্ডে যথারীতি হাজির হলাম। অবাক করার বিষয় হলো ওই বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন আশরাফুল
আমিন। আমাকে দেখে তিনি অবাক হলেন এবং বললেন আমি আগে তাকে কেন অবহিত করিনি। ইন্টারভিউ
বোর্ডের অপর দুই সদস্য। বললেন, চেয়ারম্যান স্যারের শ্যালককে আপনি পড়ান, আপনাকে আর কী
জিজ্ঞাস করবো। এভাবেই ইন্টারভিউ শেষ হলো। পরদিন বাসায় যাওয়ার পর সুফিয়া আমিন চাকরি
করব কী না জিজ্ঞাসা করলেন। আর প্রশ্ন করলেন, কেন আমি আগে তাকে জানালাম না। চাকরি করব
না এ কথা আমি তাকে বিনয়ের সাথে জানালাম। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে আমার কেন যেন
মনে হচ্ছিল, কিছু একটা ঘটে যাবে।
করাচি থেকে বের হওয়ার দু’টি পথ ছিল।
প্রথমটি হলো নৌকা দিয়ে আরব সাগর পার হয়ে কুয়েতের সাগরতীরে বুক পানিতে অবৈধভাবে নামা।
আর আরেকটি পথ হল কোথাও অ্যাডমিশন নিয়ে বিদেশে চলে যাওয়া। আমি দ্বিতীয়টি বেছে নিলাম
এবং সে অনুযায়ী চেষ্টা করতে লাগলাম। এরই মধ্যে করাচিতে একটি নাইট স্কুল ছিল। ছাত্র
হিসেবে সেখানে বিভিন্ন শ্রেণীর বয়স্কজন ছিলেন। আমরা কয়েকজন তাদেরকে বিনা পয়সায় পড়াতে
লাগলাম। করাচিতে রাতে গাধার ডাক আমার খুব বিরক্ত লাগত। আর সেখানকার অধিবাসীদের আচরণ
আমার ভীষণভাবে মনঃপীড়া দিত। করাচিতে দুপুরে অসম্ভব গরম পড়ত। তবে বিকেলে আরব সাগরের
বাতাস এসে আমাদের শরীর শীতল করে দিত। ফেডারেল ক্যাপিটাল এলাকায় একটি ছোট মার্কেট ছিল।
সেখানকার সুস্বাদু লাচ্ছি গরমের দিনে আমাদের মনপ্রাণ জুড়িয়ে দিত।
করাচিতে উর্দু শিখতে হতো। তা না হলে
চলাফেরা করা যেত না। করাচির ম্যাচ লাইফ ভালোই ছিল। অনেকের সাথে আমাদের পরিচয় হয়েছে।
অনেকেই জীবনে অনেক ভালো করেছে। আমি যে বাসাটিতে থাকতাম সেই বাসাটি নরসিংদীর হক সাহেবের
নামে বরাদ্দ ছিল। তিনি এজিতে চাকরি করতেন। মিষ্টিভাবে তার বাবাকে গালি দিতেন। কিন্তু
বেতন পেয়ে পুরো অর্থ সৎভাইদের পড়ালেখার জন্য পাঠিয়ে দিতেন। আর নিজে ম্যাচ ভাড়া দিয়ে
যা পেতেন তাই দিয়েই কোনোভাবে চলতেন। দেখেছি দু'টি শার্টের বেশি তার ছিল না। তার ঘনিষ্ঠ
বন্ধু চিত্রনায়ক আনোয়ার হোসেনের চাচাতো ভাই আমাদের সাথে থাকতেন। তিনি বিমানে চাকরি
করতেন। করাচিতে মায়ের দিকের কিছু আত্মীয়স্বজন ও আমাদের কিছু প্রতিবেশী ছিল। তারা আমার
অসম্ভব আদর যত্ন করতেন। ছুটির দিন রোববার কোথাও কোথায় আড্ডা দিতাম ও কিছু খেতাম। এরই
মধ্যে পাসপোর্ট বানানোর চেষ্টা করলাম। ফটো স্টুডিওতে গেলাম ফটো তুলতে। তারা আমাকে কালজয়ী
কণ্ঠশিল্পী ম্যাডাম রুনা লায়লার ফটো দেখালেন। তারা বললেন, এই যে শোন, ছবিতে যাকে দেখছ
তিনি তোমাদের দেশের মেয়ে। ভালো গান গায় এবং অনেক নাম করেছে। এই প্রথম আমি রুনা লায়লাকে
দেখলাম। এর বহু পরে লন্ডনে রয়েল আলবার্ট হলে তার গান পরিবেশন শুনলাম। তিনি অসম্ভব গুণী
শিল্পী। তার গানে আমাদের তিন দেশের শ্রোতাদের বিমুগ্ধ করল।
এ দিকে আমি ইতালিতে ভর্তির সুযোগ পেলাম।
পাসপোর্টও হাতে পেয়ে গেলাম। অমি যথারীতি সুযোগের অপেক্ষায় থাকলাম। আমার সাথে ফেনীর
জিল্লুর রহমান ফটিকের অ্যাডমিশন হলো। সাথে বিহারি একটি ছেলেসহ পাকিস্তান ত্যাগ করার
সুযোগ খুঁজলাম। জুলাই মাসেই সেই মহাসুযোগ এলো। আমরা করাচি থেকে ট্রেনে উঠলাম। আমাদের
ম্যাচে থাকতো মরহুম ফিরোজ। আমাদের বিদায় দেয়ার জন্য তিনি আসলেন। আমরা করাচি থেকে বের
হয়ে বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার পথে যাত্রা করলাম। তখন জুলাই মাস, অসম্ভব গরম। নিঃশ্বাস
নিতে গেলে নাক দিয়ে রক্ত আসে। এভাবেই আমরা কোয়েটা পৌছালাম। রাজধানীতে প্রবেশের সময়
তেমন কোনো যাত্রীদের তল্লাশি করা হতো না। কিন্তু বের হওয়ার সময় কড়া তল্লাশি করা হতো।
এর কারণ হলো, রাজধানী থেকে ডিউটি ফ্রি কিছু দামি পণ্য নেয়া যেত।
করাচিতে থাকার সময় অনেক মানুষের সাথে
পরিচয় হয়েছিল। অনেকের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতাম। নানাভাবে গল্পগুজব করতাম। দিনগুলো ভালোই
কাটছিল। কিন্তু যখন ইতালির উদ্দেশে করাচি ত্যাগ করলাম তখন মনে হলো আপনজনদের ছেড়ে চলে
যাচ্ছি। মন ভারাক্রান্ত ছিল। আর মনে হতে লাগল,
মেহেদি হাসানের কন্ঠের একটি গান-
হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়।
পাই না ভেবে মনে কি যে করি হায়।
স্মৃতিটুকু আছে জেগে বেদনা দিতে
আশারো বকুল সেথা পথে ঝরিতে
নীরব ব্যথা রেখে ধূলির কণা।
হাতখানি রেখে মোর হাতের পরে
বলেছিলে ভুলিবে না শপথ ভরে।
সেই কথা আজো শুধু স্বপন হয়ে৷৷
আমারে কাঁদায় শুধু রয়ে রয়ে।
সে কথা স্মরণে আজো দোলা দিয়ে যায়।
আরো মনে পড়লো মওলানা হাসরত মোহানীর
লেখা,
গোলাম আলীর কণ্ঠে গান-
চুপকে চুপকে রাত দিন অশ্রু বাহানা
ইয়াদ হায়, যা বাংলায়
চুপি চুপি রাত দিন, অশ্রু ঝরানো মনে
পড়ে,
ভালোবাসার সে দিনগুলি, আমার এখনো মনে
পড়ে।
সেই খালি পায়ে তোমার আসা;
আজো আমার মনে পড়ে।
চুপি চুপি রাত দিন, অশ্রু ঝরানো মনে
পড়ে।
দুরন্ত দুপুরে আমাকে ডাকতে, আসার ছলে
লুকিয়ে লুকিয়ে অভিসারে, তুমি এসেছিলে
কাছে
ধূসর চুলের এই সময়ে সে দিনের কথা মনে
পড়ে।
চুপি চুপি রাতদিন, অশ্রু ঝরানো মনে
পড়ে।
ভালোবাসার সে দিনগুলি আমার এখনো মনে
পড়ে।
করাচি থেকে বের হওয়ার সময় আরো মনে
পড়লো ইকবালের কালাম-
হে কুফাবাসী আমাকে মুসাফির মনে করিও
না।
আমি নিজ থেকে আসিনি, বরং আমাকে দাওয়াত
করে আনা হয়েছে।
আমি অতিথি হয়ে অত্যাচারিত হয়েছি।
আমি স্বেচ্ছায় কাঁদিনি, বরং আমাকে
কাঁদানো হয়েছে।
খোদায় জানেন, এ কেমন আতিথেয়তা।
ইকবালের আরেকটি কালাম মনে পড়লো-
অলসতার স্বপ্নে ঘুমন্ত হে মুমিন
ভোগ বিলাস বাড়িয়ে কি উপকার হবে
চোখ মেলো, উঠো প্রিয় রবকে স্মরণ করো
শোনো প্রিয় রবের জিকির
এখন চলো সত্যের পথে।
ইকবালের মৃত্যু নামে আরেকটি কালাম
মনো হলো-
বেঁচে থাকতে আমার পাশে ক্ষণিকের জন্যও
বসোনি
অথচ আজ সবাই আমার পাশেই বসে আছো
আজো অবধি কারো কোনো উপহার লাভ করনি,
অথচ আজকে যার পাশ ফুলের তোড়ায় ভরে
যাচ্ছে
মনে পড়লো ইকবালের আরেকটি কালাম-
গুরু প্রেমে যদি কাফের ফতুয়া নাই পাই
তবে পীর পূজারী হবো কী করে?
হে খোদা যে বেহেস্ত বানিয়েছো ওটা মোল্লাদের
দিয়ে দাও,
আমি বেহেস্ত চাই না, শুধু তোমার রহস্যের
মাঝে ডুবে থাকতে চাই।
মহাকবি ইকবালের জন্ম ১৮৭৭ সালে। বাবা
শেখ নূর মোহাম্মদ। তিনি একদিন স্বপ্নে দেখলেন, আকাশ থেকে সুন্দর এক কবুতর তার বাড়িতে
আসছে। স্বপ্নের তাবির হলো, ভবিষ্যতে তার ঘরে এমন একজন পুত্রসন্তান আসবে, যার নাম (পৃথিবী)
ছাড়াবে।
আর একটি বক্তব্য এমনভাবে আছে, আর তা
হলো--ইকবাল তখন মৃত্যুশয্যায়। তার এক দূরের আত্মীয় তার সাথে কথা বলছেন। এমন সময় মহাকবি
ইকবাল বললেন, যাও তো কোনার দোকান থেকে তোমার জন্য ও আমার জন্য চা নিয়ে আসো। উনার এই
আত্মীয় দোকান থেকে চা নিয়ে আসলেন। মহাকবি ইকবালও খেলেন, তার আত্মীয়ও খেলেন। আত্মীয়
বাড়িতে ফিরে সন্দেহ হলো। উনি পরদিন সকালে গিয়ে লিখলেন, দোকানও নেই, চাও নেই। কি অদ্ভুত
ব্যাপার।
এমনি আরো একটা গল্প পড়েছিলাম রিডার্স
ডাইজেস্টে। গল্পটা হলো এমন- অস্ট্রেলিয়ার এক ভদ্রলোক তার গর্ভবতী স্ত্রী ও এক সন্তান
নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। একটা ফার্ম হাউজের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তার
গাড়ি বরফে আটকে গেলো। পাড়ির দরজা খুলে সবাই বের হলেন। দেখলেন ফার্ম হাউজের কোনায় ছোট
একটি খোলা ঘর আছে। সন্তান ও স্ত্রীকে ফার্ম হাউজের ওই ছোট ঘরে বসালেন। আর নিজে গাড়িটি
ঠেলতে লাগলেন। কিন্তু গাড়িটিকে সামান্যও নাড়াতে পারলেন না। হঠাৎ করে এক ভদ্রলোক এসে
বললেন, দাঁড়াও আমরা দুইজনেই গাড়িটি ঠেলছি। দু’জনও গাড়ি ঠেলে বরফ থেকে উঠালেন। গাড়ি
স্ট্যাট দেয়ার সময় দেখলেন গাড়িতে তেল নেই। আগন্তুক বললেন, দাঁড়াও আমি তেল নিয়ে আসছি।
কিছুক্ষণের মধ্যে তেল নিয়ে আসলেন। গাড়িতে তেল ভরে স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে বাসায় চলে গেলেন।
তাদের সন্দেহ হলো, লোকটি কে। পরের দিন ওই জায়গায় আবার গেলেন। দেখলেন, ফার্ম হাউজও নেই,
ঘরও নেই। আশপাশে কোনো পেট্রোল পাম্পও নেই। কি অদ্ভুত ব্যাপার। এটাই আল্লাহ তায়ালার
কুদরাত।
করাচি থেকে বের হওয়ার সময় এসব কথা
মনে পড়ছিল। নানা ভাবে মনকে শান্ত রাখতে চেষ্টা করলাম। মনের মাঝে নানা স্মৃতি উকি দিতে
লাগলো। আরও মনে পড়তে লাগলো-
নজরুলের গান
শোন শোন ইয়া ইলাহি
আমার-ই মোনাজাত।
তোমারি নাম জপে যেন
হৃদয় দিবস রাত।
যেন কানে শুনি সদা
তোমারি কালাম হে খোদা,
চোখে যেন দেখি শুধু
কুরআনের আয়াত।
দুখে যেন জপি আমি
কলমা তোমার দিবস যামি,
তোমার মসজিদেরই ঝাড়ু বর্দার
হোক আমার এ হাত।
সুখে তুমি দুখে তুমি,
চোখে তুমি বুকে তুমি,
এই পিয়াসী প্রাণের, খোদা
তুমি আব হায়াত।
জীবনের পাতা থেকে ৮
শিব্বির মাহমুদ
আমরা কোয়েটায় তিন দিন অবস্থান করলাম।
কোয়েটায় ঝরনার পানি অনেক শীতল ছিল। চমন ভেরাইটি আঙ্গুর পাওয়া গেল। আমরা ঝরনার পানি
খেলাম ও মজা করে আঙ্গুর খেলাম। যা খাওয়া যায় ঝরনার পানিতে হজম হয়ে গেল।
তিন দিন অবস্থান করার পর আমরা কোয়েটায়
আফগানিস্তানের বর্ডারে যাত্রা করলাম। আমরা ৭-৮ জন একটি পিকআপে যাত্রা করলাম। কিছু পথ
যাওয়ার পর দেখা গেল আরেকটি পিকআপের চাকা পাংচার হয়ে গেছে। আমাদের পিকআপের ড্রাইভার
সমস্যাগ্রস্থ পিকআপের ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলেন কোনো ঝামেলা আছে কি না। তিনি বললেন
চাকা পাংচার হয়েছে এবং আমার একটি চাকা দেয়ার আছে কি। আমাদের ড্রাইভার তার একটি চাকা
দিয়ে দিলেন। আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করলাম, আপনি চাকা কেনো দিলেন। ড্রাইভার উত্তরে বললেন,
আমি যখন এ ধরনের ঝামেলায় পড়বো, আমাকেও কেউ না কেউ দিবেন। ‘হাল জাজাউল এহসানে ইল্লাল
এহসান।’ (সূরা আর রহমান।)
কিছুক্ষণ পরেই ১৭ মাইল দীর্ঘ পাহাড়ি
পথ অতিক্রম করা শুরু করলাম। সামান্য ভুল হলেই সলিল সমাধি! এভাবেই আমরা আফগানিস্তানও
পাকিস্তান বর্ডার পৌঁছলাম। যথাযথভাবে ইমিগ্রেশন হলো। কাস্টমসে কড়াকড়িভাবে চেক করা হলো।
শরীরের সব জায়গা চেক হলো (নিয়ারলি হাফ নেকেট)। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমার পকেটে কিছু
টাকা ছিল। সেটা দেখলো। নোট বুকে ১০ টাকা ছিল। পকেট মার হলে যাতে বাস ভাড়াটা দেয়া যায়
এজন্য নোট বুকে ১০ টাকা রাখা হয়েছিল। এই নোট বুকে ১০ টাকার জন্য তোলপাড় পড়ে গেলো। আমি
বলেছিলাম আমার কাছে কোনো টাকা নেই। আমরা তখন অনেকেই শুনেছি, ইমিগ্রেশনে বাংলাদেশের
কাউকে দেখলে টাকা রেখে দিতো। তাই আমি যাওয়ার সময় ভালো মানের ছোট ছোট কয়েকটি কার্পেট
ম্যাট নিয়ে গেলাম। তাতেই রক্ষা। পরে ম্যাটগুলো ইরানে গিয়ে বিক্রি করে দিয়েছি। এটাই
ছিল আমার পথের সম্বল। চেকপোস্ট পার হয়ে অতি গরমের মধ্যে বাসে ঠাসাঠাসি করে পৌঁছলাম।
গরমে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। গলা শুকিয়ে আসছে গরমে। পানি চাওয়ার পর আমাদের দেশে ছোট একটি
জগ এগিয়ে দিলো। পানি ছিল বড় একটি টিনের পাত্রে। যেটা কেরোসিনের টিনের মতো। ইশারা দিয়ে
বললাম আর কোনো ছোট গ্লাস নেই। সে বললো আমাদের মতো বড় গ্লাসে পানি খেলে আমাদের মতো লম্বা
ও শক্তিশালী হবে। তারপর আমরা এভাবেই কান্দাহার পৌঁছলাম। যতটুকু মনে পড়ে পরদিন জুমাবার
ছিল। পাশে মসজিদ ছিল। নামাজ পড়লাম। বিকেলে পাশের এক মাঠে সিনেমা দেখাচ্ছে। ফ্রি সিনেমা
দেখতে বসে গেলাম। এই প্রথম মুকেশের কন্ঠে হিন্দি গান শুনলাম-
আওয়ারা হুঁ, আওয়ারা হুঁ
ইয়া গার্ডিশ মে হুঁ আসমান কা তারা
হুঁ
আওয়ারা হুঁ, আওয়ারা হুঁ
ইয়া গার্ডিশ মে হুঁ আসমান কা তারা
হুঁ
আওয়ারা হুঁ-
আমরা ২-৩ দিন থেকে বাসপথে ইরান ও আফিগানিস্তান
সীমান্ত হেরাত পৌঁছলাম। চেকপোস্ট সেরে আমরা ইরানের বর্ডার শহর মাশহাদের দিকে রওয়ানা
হলাম। মাশহাদে তখন শীত পড়ছিল। মাশহাদ হলো ইরানের ধর্মীয় রাজধানী। শহরটি পরিপাটি এবং
নিখুঁতভাবে সাজানো গোছানো। গাছের ফাঁকে ফাঁকে বৈদ্যুতিক বাতি অনেক শোভা বর্ধন করেছে।
আল্লাহর রহমতে পৃথিবীর অনেক শহর ঘুরেছি। কিন্তু মাশহাদের মতো এমন গোছানো শহর কম দেখেছি।
দুই তিন দিন থেকে দুই সাথিসহ আমরা তেহরানের দিকে রওয়ানা হলাম। মাশহাদ থেকে তেহরানের
রাস্তার পাশে বরফগলা পানি নামার জন্য নহর ছিল। সারাক্ষণই কলকল শব্দ শুনেছিলাম এবং দেখছিলাম।
এই ভ্রমণ অসম্ভব রকমের ভালো লেগেছিল।
তেহরানে পৌছেই একটি গেস্ট হাউজে থাকলাম। প্রথম দিকে আমরা ছোট একটি গেস্ট হাউজে থাকা
শুরু করলাম। ওদের ছোট একটি বাথরুমেই গোসলের কাজ সারতাম। কিন্তু তখনও আমরা জনতাম না
বাথরুমে গোসল করা নিষেধ। সেখানে হাম্মামখানায় গোসল করে। দুই দিন থাকার পর তেহরানে পাকিস্তান
দূতাবাস খুঁজতে লাগলাম। খোঁজখবর নিয়ে পাকিস্তান দূতাবাসে পৌছালাম। দূতাবাসের একটা জানালার
বিপরীত পাশে দূতাবাসের অফিসার দাঁড়াল। আমি বিপরীত দিকে দাঁড়ালাম। কর্মকর্তা আমার পাসপোর্ট
নেড়েচেড়ে দেখলেন। আমার বাড়ি, নাম, বাবার নাম ইত্যাদি মিলিয়ে দেখলেন। তারপর আবার আমার
নাম জিজ্ঞাসা করলেন। আমার দাদার নাম উচ্চারণ করে বললেন, তাঁদের কোন পাশে আমাদের বাড়ি।
আমি বললাম, তিনিই আমার দাদা। কর্মকর্তা বললেন, তিনি কি তোমাকে আসতে দিলেন? আমি বললাম,
আমি আমার দাদার অনুমতি নিয়েই দেশ থেকে বের হয়েছি। আরো নানা প্রশ্ন করলেন। ওই কর্মকর্তার
নাম রফিকুল হায়দার। তিনি নন-ক্যাডার অফিসার ছিলেন। মায়ের দিকের আত্মীয়। উনাকে আমি ছোটবেলা
দেখেছি। আমাদের বাড়িতেও এসেছিলেন। আমি তাঁকে চিনলাম। তিনি বললেন, এসব কথাবার্তা পরে
হবে। দুপুরে বাসায় চলো। এক সাথে খাবো। রফিকুল হায়দার সাহেবের স্ত্রীও মায়ের দিক থেকে
আত্মীয়। বাসায় গিয়ে খাওয়া দাওয়া করলাম। অনেক দিন পর ভাত খেয়ে মনে হলো অমৃত খেলাম। বুঝুন
আল্লাহর কেরামতি কাকে বলে।
রফিকুল ভাইকে অনুরোধ করলাম আমার পাসপোর্ট
ওয়েস্ট জার্মানির এনডোর্স করানোর জন্য। তিনি এবং দূতাবাসের তখনকার ফার্স্ট সেক্রেটারি
মাহমুদুল হক আমাকে অনুরোধ করলেন, তেহরানে থেকে যাওয়ার জন্য। তারা আমাকে সতর্ক করে বললেন,
আমি যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে না যাই। আমি উত্তরে বললাম, আমরা কয়েক মাসের মধ্যে স্বাধীন
হয়ে যাচ্ছি ইনশাআল্লাহ। তখন কী হবে। যেহেতু ইরান তখন আরসিডির মধ্যে অন্যতম দেশ। তারা
আমাকে বোঝালেন, তেহরানে চাকরি করলেই ওয়ার্কপারমিট পাবে এবং নির্বিঘ্নে এক বছর থেকে
যেতে পারবে। আমি তখন নানাবিধ ভেবে ওই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চাকরি নেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত
জানালাম। সেই মোতাবেক ওই স্কুলে আমার চাকরি হলো এবং ওয়ার্ক পারমিটও হলো।
তেহরান অত্যন্ত চাকচিক্যময় ও পরিষ্কার
শহর। বাস কাউন্টার থেকে টিকিট নিলাম। বাসে উঠে টিকিট বাস কন্টাক্টরকে দিলে তিনি টিকিট
ছিঁড়ে পাশে থাকা বিনে ফেলে দিতো। এতে বাস টিকিট আশপাশে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকতো না। কোনো
ভিক্ষুক ছিল না। কোনো অন্ধ বা শারীরিক প্রতিবন্ধী বাসে উঠে সুন্দর করে যন্ত্র বাজাতো।
কেউবা গান গাইতো। তবে তারা কোনো ভিক্ষা চাইতো না। বাসযাত্রীরা খুশি হয়ে তাদেরকে কিছু
টাকা পয়সা দিতো।
তেহরানের রাস্তাগুলোর নাম কবি, মহাকবি
ও তাদের রাজা বাদশাদের নামে নামকরণ ছিল। যেমন একটি চৌরাস্তার নাম ছিল- ফেরদৌসি স্কয়ার।
অথবা শেখ শাদী, ওমর খৈয়াম, হাফিজ, রুমী ইত্যাদি। ফার্সি ভাষাও ছিল অনেক মধুর। কথোপকথনের
সময় অনেক প্রতিশব্দ খুঁজে পাওয়া যায়।
এর মধ্যে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চাকরি
শুরু করলাম। থাকা শুরু করলাম এম এন মাহমুদ সাহেবের বাসায় সাবলেট নিয়ে। অক্টোবরে চাকরি
হলো। তখনই শীত পড়া শুরু হলো। আমি যে বাড়িতে থাকা শুরু কলাম সেই বাড়ির মালিক ছিলেন একজন
বৃদ্ধা মহিলা। প্রতি বৃহস্পতিবার জানালা, দরজাসহ ঘর পরিষ্কার করতেন। ওই দিন সবধরনের
সবজি দিয়ে একটা লাফড়া (এক ধরনের সবজি) বানাতেন। আমরা মজা করে তা খেতাম। এই প্রথম আস্তে
আস্তে রান্না করে খাওয়া শুরু করলাম। এক দেড় মাসের মাথায় হঠাৎ করে এম এন মাহমুদ সাহেবের
দূর সম্পর্কের আত্মীয় নামকরা ফটোগ্রাফার কিউ জামান ও তার স্ত্রী নায়িকা সুলতানা জামান
তেহরানে আমাদের বাসায় হাজির হলেন। এম এন মাহমুদ সাহেব আগে থেকেই স্কুলে প্রশাসনিক কাজ
করতেন। এখন কিউ জামান সাহেব লন্ডনে যাবেন। ভিসা প্রসেসিংয়ের জন্য এক থেকে দুই মাস প্রয়োজন।
সিদ্ধান্ত হলো আমাদের বাসাতেই থাকবেন। আমি আবারো গৃহহীন হয়ে পড়লাম। এই সময় রফিকুল হায়দার
ভাই আবারো আমাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসলেন। তিনি বললেন, আমার বাসায় একটি রুম খালি
আছে। তুমি আমার বাসাতেই থাকো। আমি যে স্কুলে চাকরি করতাম সেই স্কুলেই রফিকুল হায়দার
এর ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করত। একসঙ্গে স্কুলে আসা-যাওয়া করা যাবে। সিদ্ধান্ত হলো তার
বাসায় পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকবো। স্কুলে যাওয়া আসার যেকোনো এক দিকের ভাড়া আমি পরিশোধ
করবো, আর অপর দিকের ভাড়া পরিশোধ করবেন রফিকুল হায়দার ভাই। এ ধরনের সিদ্ধান্তে আমার
খুবই ভালো লাগলো। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ছিল। পায়ে বরফ পড়লে যেন পা-টা ফেটে যেতো। এভাবেই দিন
গুজরান শুরু করলাম।
এদিকে ফার্সি ভাষা শেখার চেষ্টা করতে
লাগলাম। এমন সময় কাজী আফজালুর রহমান সাহেব তেহরানে পাকিস্তান দূতাবাসে পোস্টিং নিয়ে
আসেন। তিনি পাকিস্তানের ফরেন সার্ভিসে ছিলেন। প্রশিক্ষণ শেষে তেহরান দূতাবাসে থার্ড
সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ পান। ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করতে গিয়ে তার নিউমোনিয়া হয়। এক
পর্যায়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। তখন ছিল রোজার মাস। তাকে হাসপাতালে দেখাশোনার
জন্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না। সবাই মিলে আমাকে অনুরোধ করলেন হাসপাতালে তার দেখাশোনার
জন্য। সবার অনুরোধে আমি হাসপাতালে তার সাথে থাকলাম। ভোর রাতে হাসপাতালের ডিউটিরত এক
কর্মচারী এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আমি রোজা থাকবো কি না? আমি বললাম ইনশাআল্লাহ। আফজাল
সাহেব তখন ঘুমের ঘোরে ছিলেন। আমাকে তিনি না খেয়ে রোজা রাখতে নিষেধ করলেন। আমি অনড় থাকায়
এক পর্যায়ে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তিনি আমার কোনো কথাই শুনতে চাইলেন না। এর ফলে
আমি ওই দিন রোজা রাখলাম না। পরে জেনেছি এই আফজাল সাহেব কাজী ফজলুর রহমান সিএসপি এবং
কাজী বজলুর রহমানের ছোট ভাই। কাজী বজলুর রহমান পাকিস্তানের পুলিশ সার্ভিসে ছিলেন। পরবর্তীকালে
কাজী ফজলুর রহমান আহসানিয়া ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজির প্রথম সিন্ডিকেটের
চেয়ারম্যান ছিলেন, আর আমি ছিলাম সিন্ডিকেটের মেম্বার যা আজ অবধি আছি।
কাজী বজলুর রহমানের সাথে একবার হিথ্রো
বিমান বন্দরে দেখা হয়েছিল। আর কাজী ফজলুর রহমানের সাথে মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত যোগাযোগ
ছিল। মজার ব্যাপার এল, ৮৫-৮৬ সালের দিকে আমি একবার নিউ ইয়র্কে যাই। কাজী আফজালুর তখন
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর ছিলেন। আমি তার সাথে দেখা করতে যাই। তার
ব্যস্ততার জন্য তার সাথে তেমন কোনো আলাপ হয়নি। আমি যে বাসায় উঠেছি তিনি শুধু ওই বাসার
টেলিফোন নম্বর রেখে দিলেন। তিনি ওই দিন সন্ধায় আমাকে টেলিফোন করলেন। আমি টেলিফোন রিসিভ
করলে তিনি তার লং আইল্যান্ডের বাসায় যেতে বললেন। আমি ঠিকানা নিয়ে তার বাসায় গেলাম।
তখন তার বাসায় তিনজন মেহমান ছিলেন। তারা হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মোহাম্মদ
আলী, সাংবাদিক জগলুল আহমেদ চৌধুরী ও সুইডেনের বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। আর চতুর্থজন হলাম
আমি। ওই দিন তার বাসায় অনেক হাসি, ঠাট্টা, আলাপ হালোচনা হলো। এক সময় সুইডেনের রাষ্ট্রদূত
আফজাল সাহেবকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘হে আফজাল, তোমার দেশে গেলাম, কোনো বাড়িঘর দেখলাম
না। তোমরা থাকো কোথায়?’ আফজাল সাহেব বুদ্ধিমত্তার সাথে উত্তর দিলেন, স্যার আমরা বুদ্ধি
বেচে খাই, বাড়িঘরের দরকার হয় না।’
কাজী আফজাল সাহেবের বাসায় এক ছেলে
ও এক মেয়ে দেখেছিলাম। ছেলের বয়স ছিল চার কি পাঁচ। সেই ছেলেই কাজী ছাবিল রহমান হার্ভার্ডসহ
বিশ্বের বিভিন্ন নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেও ল’ এর ওপর উচ্চতর ডিগ্রি
নিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কেবিনেটে আছেন। কাজী আফজালুর রহমান
বহুদিন জাতিসঙ্ঘে চাকরি করে এখন অবসর জীবন-যাপন করেন।
তেহরান দূতাবাসে তখন যিনি ফার্স্ট
সেক্রেটারি ছিলেন তার নাম ছিল মাহমুদুল হক সাহেব। তিনি পরবর্তীতে জাপানে রাষ্ট্রদূত
হয়েছিলেন। তারেক করিম সাহেবও তিনি তখন সেকেন্ড সেক্রেটারি ছিলেন। পরে তিনি রাষ্ট্রদূত
ও সচিব হয়েছিলেন।
বর্তমানে আইইউবি এর উপদেষ্টা তখন তার
তেহরানের বাসায় একবার জাঁকজমন ডিনারের আয়োজন করলেন। এই প্রথম কারো বাসায় উঁচু মানের
ডিনারে অংশগ্রহণ করলাম। অনেক ধরনের খাবার দেখে আমার তো মাথা ঘুরে গেছে। কিভাবে খাওয়া
দাওয়া করবো। তেহরানে বাংলাদেশী সব কর্মকর্তার সহযোগিতা পেয়েছি। দেশের প্রতি মমত্ববোধ,
দেশপ্রেম সবই আমি পরিলক্ষিত করি। আমি সেই ডিনারে উপস্থিত ছিলাম।
